নদিয়া জেলার করিমপুরের কবি ও শিশু সাহিত্যিক পরিতোষ সরকারের মুখোমুখি । "বর্তমান ভারত বার্তা" পত্রিকার পক্ষে __সৌভিক চক্রবর্তী।
নদিয়া জেলার করিমপুরের কবি ও শিশু সাহিত্যিক পরিতোষ সরকারের মুখোমুখি । "বর্তমান ভারত বার্তা" পত্রিকার পক্ষে __সৌভিক চক্রবর্তী।
সৌভিকঃ স্যার, প্রথমেই জানতে চাই, শিশু ও কিশোরদের জন্য লেখার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পান ? বা শুরু টা কিভাবে ?
পরিতোষ সরকারঃ ১৯৯৮-২০১০ এই সময়ে আমি গৃহ শিক্ষকতা করেছি, যার ফলে শিশু ও কিশোরদের সাথে খুব নিবিড় ভাবে মেশার সুযোগ আমার হয়েছে। সুতরাং শিশুরাই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাদের প্রাঞ্জল হাসি, প্রশ্ন, কৌতূহল, আবদার, দুষ্টুমি, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার সহজ স্বভাব আমাকে বারবার লিখতে শেখায়। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশুর ভেতরে একটি আলাদা আলাদা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারা মানেই শিশু সাহিত্যের জন্ম। আমি তখন থেকেই শিশুদের নিয়ে লেখা শুরু করি। আর, এ প্রসঙ্গে বলে রাখি আমার স্যার ড. দূর্বাদল দত্ত মহাশয় শুরুতে খুব আন্তরিক ভাবে সাহায্য করেছিলেন। এখনো করেন।
সৌভিকঃ শিশুদের জন্য লেখা কি বড়দের জন্য লেখার চেয়ে কঠিন ?
পরিতোষ সরকার: অবশ্যই। শিশুদের ফাঁকি দেওয়া যায় না। একদম না । তারা কৃত্রিমতা পছন্দ করে না। তাদের ভাষায়, তাদের অনুভূতিতে, তাদের আনন্দের জগতে প্রবেশ করতে হয়। তাই শিশুদের জন্য লেখা সহজ মনে হলেও, আসলে এটি অত্যন্ত দায়িত্বের কাজ।
সৌভিকঃ স্যার, আপনার লেখায় বারবার প্রকৃতি, গ্রামবাংলা ও খুব সাধারণ মানুষের জীবন উঠে আসে। কেন ?
পরিতোষ সরকার: আমি প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বাস করি ,যে কারণে আমি মনে করি, প্রতিটি শিশুর-ই শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়া খুব জরুরি। মাঠ, নদী, গাছ, ফুল ,পাখি, মেঘ, মা, বাবা, পরিজন —এসবের মধ্যেই আমাদের সংস্কৃতির সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। শিশুরা যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে, তবে মানুষকেও ভালোবাসতে শিখবে।
সৌভিকঃ স্যার, আপনার দু'একটি কবিতা শুনবো।
পরিতোষ সরকারঃ
কুটুম
ছাদ থেকে গাঙ দেখি
পাখিদের ডাক,
পটপানা বেড়ে চলে
মাছেদের ঝাঁক।
পাঁকুড়ের ছায়া মেখে
জেলেদের ঘুম,
সারাদিনে ফিরে গেছে
হাজার কুটুম।
দাদুর লাঠি
হুনু এলো কলা খেতে
ডিঙি পারের মাঠে,
তাই না দেখে দাদুর ভেতর
ছটফটানি ওঠে।
দাদুর বয়স আশি বছর
ছুটতে কি আর পারে?
তবু তিনি মনের জোরে
লাঠি নিল ঘাড়ে।
দাদুর ভয়ে হুনুরা সব
গাছের ভেতর চুপ,
লাঠি দেখে দৌড় দিল
ডাকছিলো হুপ্ হুপ্ ।
গাঙের পাখি
গাঙ ভরা জল
করে টলমল
আকাশেতে পাখি ওড়ে
মুখে নিয়ে ফল ।
ফল দেখে লোভ জাগে
মনে মনে ভাবি
পাখি তুমি বলে যাও-
এক কামড় খাবি' ?
সৌভিকঃ বর্তমান সময়ে মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে বইয়ের গুরুত্ব কি কমে যাচ্ছে ?
পরিতোষ সরকার: (একটু হেসে)সত্যি কথা বলতে প্রযুক্তি শত্রু নয়, তবে বইয়ের বিকল্পও নয়। একটি বই শিশুকে কল্পনা করতে শেখায়, ধৈর্য শেখায়, ভাবতে শেখায়। প্রযুক্তি ও বই—দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সৌভিকঃ আপনার মতে একটি ভালো শিশু সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
পরিতোষ সরকার: সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, নির্মল আনন্দ এবং মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ। শিশু সাহিত্য কখনো ভারী উপদেশের বই নয়।
সৌভিকঃ অভিভাবকদের উদ্দেশে আপনার কী বার্তা?
পরিতোষ সরকার: শিশুদের হাতে শুধু মোবাইল নয়, বইও তুলে দিন (অবশ্যই জন্মদিনে) । প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় তাদের সঙ্গে বসে গল্প পড়ুন, কবিতা পড়ুন। পরিবার থেকেই একজন পাঠকের জন্ম হয়।
সৌভিকঃ নতুন যারা শিশু সাহিত্য লিখতে চান, তাদের কী বলবেন ?
পরিতোষ সরকার: প্রথমে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান। তাদের কথা শুনুন, তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখুন। বেশি নীতিকথা নয়, ভালো গল্প লিখুন। শিশুমনকে সম্মান করুন—তবেই ভালো লেখা জন্ম নেবে।
সৌভিকঃ আপনার কাছে শিশু সাহিত্য কী ?
পরিতোষ সরকার: আমার কাছে শিশু সাহিত্য ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সৃজনশীল মাধ্যম। একটি সুন্দর কবিতা, একটি ছোট গল্প বা একটি ছড়া হয়তো একজন শিশুর মনে আজীবনের জন্য ভালোবাসা, সততা, সাহস কিংবা স্বপ্নের বীজ বপন করে দিতে পারে। একজন শিশু সাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো—কোনো শিশুর মুখে নিজের লেখা শুনতে পাওয়া।
সৌভিকঃ শিশু কবিতা লিখতে হলে ছন্দ জানা প্রয়োজন ?
পরিতোষ সরকার: অবশ্যই প্রয়োজন। আমি মনে করি, শিশু কবিতার প্রাণই হলো ছন্দ। শিশুরা প্রথমে কবিতার ভাব নয়, তার সুর, তাল ও ছন্দকে অনুভব করে। তাই ছন্দ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে শিশু কবিতা সহজে মুখে লেগে থাকে না। অনেকেই অন্ত্যমিল রেখে ভাবেন এটাই ছন্দ।
আর, ছন্দ জানা মানে শুধু কঠোর নিয়ম মুখস্থ করা নয়। কমপক্ষে বাংলা কবিতার স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত—এই প্রধান ছন্দরীতিগুলোর মৌলিক ধারণা একজন শিশু সাহিত্যিকের থাকা উচিত। এরপর সেই ছন্দকে স্বাভাবিক ও সাবলীল ভাষায় ব্যবহার করতে পারলে কবিতা শিশুর কানে গান হয়ে বাজে।
সৌভিকঃ বর্তমান সময়ে শিশু কবিতা বড়দের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক ?
পরিতোষ সরকারঃ খুব সুন্দর প্রশ্ন। অনেক প্রাসঙ্গিক। আমি পার্কে বসে দেখেছি শিশুদের সাথে বড়রাও দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে। আমার মনে হয় আমরা সবাই দোল খেতে ভালোবাসি। আসলে মাতৃ গর্ভ থেকে আমাদের এই অভ্যাস। সুতরাং, প্রকৃত পাঠকদের কাছে শিশু কবিতা চিরদিনের প্রাসঙ্গিক।
সৌভিকঃ সবশেষে পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।
পরিতোষ সরকার: শিশুদের জন্য লিখুন, শিশুদের বই উপহার দিন, (বিশেষ করে জন্ম দিনে) তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিন। যে সমাজ শিশুদের কল্পনাশক্তিকে লালন করে, সেই সমাজই আগামী দিনে জ্ঞান, মানবিকতা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
----------------------------------
৫ই জুলাই, ২০২৪। বেলঘড়িয়া। রাত্রি।
Comments
Post a Comment