দত্তপুকুরের 'অনুভূতি আবৃত্তি কেন্দ্র'-এর ৫ বছরে পদার্পণ: রবীন্দ্র জয়ন্তীর মঞ্চে শিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন


**নিজস্ব প্রতিনিধি, দত্তপুকুর: পঁচিশে বৈশাখ মানেই বাঙালির হৃদয়ে এক অনন্য আবেগ, এক চিরন্তন উৎসব। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৩তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের সাথে সাথে মেতে উঠেছে উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরও। এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল স্থানীয় আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অনুভূতি। এই বছর সংস্থাটি তাদের যাত্রার পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করল। বিবিপি টিভি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অনুষ্ঠানের নানা বর্ণময় মুহূর্ত এবং এই প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে থাকা কারিগরদের নিরলস পরিশ্রমের কাহিনী।


পাঁচ বছরের পথচলা: একটি ছোট চারাগাছ থেকে মহীরুহ


‘অনুভূতি’ আবৃত্তি কেন্দ্রের এই পথচলা খুব বেশি দিনের না হলেও, এর সাফল্যের ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। ২০২০ সালের এক কঠিন সময়ে মাত্র ৭ থেকে ৮ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হয়েছিল এই পথচলা। আজ পাঁচ বছর পরে সেই ক্ষুদ্র আয়োজন এক বিশাল ‘অনুভূতি পরিবারে’ পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই এই অগ্রগতির কথা স্মরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘ যাত্রার কথা বলতে গিয়ে জানানো হয় যে, গত পাঁচ বছর ধরে প্রতিবারই রবীন্দ্র জয়ন্তী পালিত হয়ে আসছে, তবে এবারের আয়োজন ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত ও বর্ণাঢ্য।


নির্মাতা ও কান্ডারি: ইলা রায় মল্লিকের ভাবনা


এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইটের পেছনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও শৈল্পিক ভাবনা জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন ইলা রায় মল্লিক। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তিনি শুধুমাত্র একজন আবৃত্তি শিক্ষকই নন, বরং একাধারে লেখিকা, গল্পকার। এমনকি অতীতে তিনি আকাশবাণী চ্যানেলের আরজে (RJ) হিসেবেও কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনায় ‘অনুভূতি’ আজ তার নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে। ইলা রায় মল্লিকের মতে, আবৃত্তি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি মানুষের আত্মিক বিকাশের এক অন্যতম মাধ্যম।


বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান: নাট্যরূপ ও আঁকিবুঁকির মেলবন্ধন


এবারের রবীন্দ্র জয়ন্তীর বিশেষ আকর্ষণ ছিল কবিগুরুর কবিতাগুলোর নাট্যরূপ প্রদান। ইলা রায় মল্লিক নিজেই রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতাকে নাটকের রূপ দিয়েছেন, যা খুদে শিক্ষার্থীরা মঞ্চস্থ করার চেষ্টা করেছে। এই অভিনব প্রয়াসের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের গভীরে প্রবেশের এক সুযোগ তৈরি হয়েছে।


অনুষ্ঠানের আরেকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক ছিল আবৃত্তি ও অঙ্কন প্রতিযোগিতা। ইলা রায় মল্লিক একটি পর্যবেক্ষণ হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন লিখতেন, তখন তাঁর কাটাকুটিগুলো থেকেও এক একটি শিল্প বা ছবির জন্ম হতো। কবির এই বিশেষ দিকটিকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কবিতার লাইন নির্ধারিত ছিল। সেই লাইনটিকে ভিত্তি করে শিশুরা তাদের কল্পনাশক্তি দিয়ে ছবি এঁকেছে। যারা এই সৃজনশীল কাজে সফল হয়েছে, তাদের বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, পুরস্কার প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং কবির প্রতি এই শ্রদ্ধা নিবেদনই হলো মূল সার্থকতা।


আবৃত্তি: শব্দের ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ও শৈল্পিক বিকাশ


প্রতিবেদনে আবৃত্তির গুরুত্ব সম্পর্কে এক গভীর দর্শনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা এই স্মৃতি শিল্প বা শ্রুতি শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। ইলা রায় মল্লিকের ভাষায়, “একটি মানুষকে যদি সঠিকভাবে এগোতে হয়, তবে তাকে সঠিকভাবে কথা বলা শিখতে হয়”। তিনি শব্দকে ‘ব্রহ্মাস্ত্রের’ সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রতিটি শব্দের এক গভীর অর্থ ও গাম্ভীর্য রয়েছে । তাই সঠিক উচ্চারণ এবং স্মৃতিশক্তির চর্চা আবৃত্তির অন্যতম প্রাণ। এই শিল্পের সংস্পর্শে থাকলে মানুষের মনের শৈল্পিক বিকাশ ঘটে এবং মানুষের বোধ বা চেতনা জাগ্রত হয়।


সহযোদ্ধা ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা


‘অনুভূতি’ কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি অনেকের কাছেই নতুন জীবনের দিশারি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন। চন্দ্রাদেব রায় বিশ্বাস নামের এক অভিভাবিকা জানান, এই আবৃত্তি কেন্দ্র তাঁকে একটি নতুন জীবন দিয়েছে, জীবনের কঠিন মোড়ে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে।


অন্য এক অভিভাবিকা পিঙ্কি রায় তাঁর ছেলের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর ছেলে যখন মাত্র ২ বছর ১০ মাস বয়স থেকে কথা বলা শিখছিল, তখন থেকেই সে এই কেন্দ্রের সদস্য। বর্তমানে ৪ বছর ১০ মাস বয়সে সে স্বাবলম্বীভাবে বাংলা পড়তে শিখেছে এবং তার মধ্যে চারিত্রিক ও শৈল্পিক বিকাশ লক্ষ্য করা গেছে। অভিভাবকদের মতে, ইলা রায় মল্লিকের সান্নিধ্যে এলে যে কোনো মানসিক দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশন মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে যায়।


শিক্ষার্থী ও সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি কেবল একজন দিদি নন, বরং একজন মাতৃসম ব্যক্তিত্ব। বিপাশা ভদ্র, যিনি নিজের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর এখানে বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চা করতে এসেছেন, তিনি মনে করেন যে বাংলা ভাষাকে আরও গভীরভাবে শেখার ও জানার জায়গা হলো এই ‘অনুভূতি’। অন্য এক ছাত্রী দিশা দেবনাথের মতে, এই কেন্দ্র মানেই একরাশ ভালোবাসা এবং অনুশাসন, যেখানে দিদিই শেষ কথা।


ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও উপসংহার


‘অনুভূতি’ আবৃত্তি কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হলো শুদ্ধ উচ্চারণ এবং শৈল্পিক চেতনার প্রসার ঘটানো। যে ছোট্ট পরিবারটি কয়েক বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা অনেক বড় হয়েছে। উদ্যোক্তাদের আশা, একদিন এই ‘অনুভূতি’ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদকে বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে। কবির সেই গান— "আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী"— যেন সার্থক হয়ে ওঠে এমন সব শৈল্পিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে।


অনুষ্ঠানটির শেষে বিবিপি টিভি বাংলার পক্ষ থেকে ডি বাসু এবং ক্যামেরায় ইমন সকলকে রবীন্দ্র জয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানান এবং ‘অনুভূতি’ পরিবারের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই জয়গান যেন আগামী দিনগুলোতেও একইভাবে বজায় থাকে, সেই প্রত্যাশাতেই শেষ হয় এই বছরের রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব।

Comments

Popular posts from this blog

অশোকনগরে পরিবর্তনের ডাক: নিকাশি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে জয়ের লক্ষ্যে বিজেপি

শান্তিনিকেতনে ‘একদুনিয়া’র শুভ সূচনা: প্রযুক্তি ও প্রতিভার নতুন দিগন্ত