অশোকনগরের আর্বান কলোনিতে দুর্নীতির পাহাড়? দীর্ঘ বঞ্চনার শেষে নাগরিক পরিষেবার দাবিতে সরব ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা



**অশোকনগরের আর্বান কলোনিতে দুর্নীতির পাহাড়? দীর্ঘ বঞ্চনার শেষে নাগরিক পরিষেবার দাবিতে সরব ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা**

**নিজস্ব প্রতিনিধি, অশোকনগর:** স্বাধীনতার কয়েক দশক পরেও পশ্চিমবঙ্গের বহু উদ্বাস্তু কলোনি বা আর্বান কলোনিগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অশোকনগর বিধানসভার অন্তর্গত ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সমলক্ষী কলোনির চিত্রটি বর্তমানে অত্যন্ত করুণ। দীর্ঘ বঞ্চনা, জরাজীর্ণ রাস্তা এবং ভেঙে পড়া নিকাশি ব্যবস্থার প্রতিবাদে এবার সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা জনস্বার্থে ব্যবহৃত না হয়ে শাসকদলের নেতা ও বিধায়কদের পকেটে গেছে।
**দীর্ঘ কয়েক দশকের বঞ্চনা:**
সমলক্ষী কলোনির বাসিন্দাদের দাবি অনুযায়ী, তারা কেবল গত ১০ বা ১৫ বছর নয়, বরং দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে (বাম আমলের ৩৪ বছর এবং পরবর্তী তৃণমূল শাসনকাল) উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই এলাকাটি সবসময় অবহেলিত থেকেছে। স্থানীয় এক বিজেপি কর্মকর্তার মতে, এখানকার মানুষ সম্ভবত বিরোধী দল সমর্থিত হওয়ার কারণেই বর্তমান সরকার (তৎকালীন শাসকদল) এই অঞ্চলের রাস্তার অবস্থা নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। বর্ষার সময় রাস্তার হাল এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে সাধারণ মানুষের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
**উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ:
প্রতিবেদনে উঠে আসা সবথেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো উদ্বাস্তু কলোনির উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আসা অর্থের নয়ছয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আর্বান রিফিউজি কলোনির উন্নয়নের জন্য দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু তাদের অভিযোগ, সেই ৬০ কোটি টাকার এক পয়সাও সমলক্ষী বা পার্শ্ববর্তী কলোনির মানুষের উপকারে লাগেনি। 

স্থানীয় বাসিন্দা তারক দে এবং অন্যান্যদের মতে, প্রতিটি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা শাসকদলের উচ্চপদস্থ নেতা এবং বিধায়কদের অনুগামীরা বা "চেলা-চামুণ্ডারা" লুটেপুটে খেয়েছে। দুর্নীতির মাত্রা বোঝাতে গিয়ে এক প্রতিবাদী বাসিন্দা জানান, এলাকায় একটি ড্রেন তৈরি করতে যেখানে ১০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা, সেখানে সরকারি খাতায় ৬ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অর্থের এই ব্যাপক অপচয় ও লুটপাটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ এখন তীব্র ক্ষুব্ধ।

**শিলান্যাস আছে, কাজ নেই:**
অভিযোগের তালিকায় আরও একটি বড় বিষয় হলো সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির থেকে একটি হাই ড্রেন নির্মাণের প্রকল্প। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ কোটি টাকা বাজেটের এই ড্রেন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী (ভার্চুয়ালি)। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলো, কাজ শুরু হওয়া তো দূরের কথা, সেখানে কেবল উদ্বোধনী ফলক বা শিলান্যাসটি স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বাসিন্দাদের প্রশ্ন, যদি টাকা বরাদ্দ হয়ে থাকে এবং শিলান্যাস হয়ে থাকে, তবে সেই ৬ কোটি টাকা কোথায় গেল? এই টাকা কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং সাধারণ মানুষের করের টাকা বলে তারা দাবি করেন।

**রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন আশা:**
অশোকনগরের এই অঞ্চলে বর্তমানে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। bbp tv bangla এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা এখন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির 'সবকা সাথ, সবকা বিকাশ' মন্ত্রেই এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অন্ধকার ঘুচবে। মণ্ডল সভাপতি দীপঙ্কর চক্রবর্তী আশাপ্রকাশ করেছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাস্তা, ড্রেন এবং শিল্পের উন্নয়ন হবেই। 

বাসিন্দারা হুঙ্কার দিয়েছেন যে, তারা আর এই দুর্নীতি মুখ বুজে সহ্য করবেন না। বিগত সরকারের আমলে যে লুটপাটের সংস্কৃতি চলেছে, তার পাই-পাই হিসাব নেওয়া হবে বলে তারা মনে করেন। নাগরিকরা চান নূন্যতম গণতান্ত্রিক পরিষেবা—ভালো রাস্তা, পরিষ্কার জল এবং উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা।
অশোকনগরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সমলক্ষী কলোনির এই চিত্রটি পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রান্তিক এলাকারই প্রতিচ্ছবি। একদিকে রাজনৈতিক লড়াই, অন্যদিকে উন্নয়নের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তারা কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বরং হাতেকলমে কাজ দেখতে চান। দীর্ঘ বঞ্চনার পর এখন দেখার বিষয়, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অশোকনগরের এই উদ্বাস্তু কলোনিগুলোর ভাগ্য আদৌ ফেরে কি না।

Comments