বিয়াস ( এক নদী ও এক নারী'র গল্প ) সুদর্শন দত্ত -পর্ব দুই
বিয়াস ( এক নদী ও এক নারী'র গল্প )
সুদর্শন দত্ত
।। দুই ।।
রাতটা দিল্লিতে কাটিয়ে পরের দিন ফ্রেশ হয়ে খুব সকালে শিমলার উদ্দেশ্যে রওনা দিল ঋক। প্রথমে ভেবেছিল সরকারি বাসে করেই যাবে। পরে একটা গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথের জার্নি। ঘুমিয়ে, জেগে, বসে, মোবাইল দেখে পাড়ি দিতে দিতে কখনও কোনো চটিতে, কখনও কোনো বড়সড় খাবারের দোকানে গাড়ি থেকে নেমে যতটা না খেয়েছে তার চেয়ে বেশি হাত পায়ের আড়মোড়া ভেঙেছে। এই পথে আনন্দ যেমন আছে, তেমনই আছে শারীরিক যন্ত্রণা। তবে সেসব ছাপিয়ে আনন্দই বেশি। কারণ, নতুন দেশ, নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। বিশ্ববিধাতার আপন হাতের সৃষ্টিকে চোখ মেলে দেখা ও অনুভব করার যে আনন্দ, তা শুধু মন থাকলেই হয় না, আলাদা মননও লাগে।
একটা পাহাড়ি চটিতে গাড়িটা দাঁড়ালে নেমে চা পান করে, জ্বলন্ত সিগারেট হাতে ইতস্তত হাঁটাহাটি করতে করতে দূরের দৃশ্যাবলী উপভোগ করছিল ঋক। ঠিক তখনই অনতিদূরের একটা দৃশ্যে চোখ আটকে যায়। একটা আপাত নিরীহ শীর্ণকায় ঝর্ণার জলে পা ডুবিয়ে একটা মেয়ের খেলা করার ঘটনা মুহূর্তে তার মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। হয়তো কিছুটা চমকেই ওঠে। চঞ্চল হয়ে পড়ে তার কথা ভেবে, যার জন্য আজ আবার আসা। সেই পাট্টু, সেই ধাতুর সাজ, সেই গড়ন! অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে মাত্রই মাস চারেক আগের সেই দিনের কথা ভেবে। সেটা ছিল মার্চ মাসের একেবারে শেষের দিকে। কোলকাতায় তখন সবে গরম পড়তে শুরু করেছে। বন্ধুদের কথামত আর তার ঘুরে বেড়ানোর নেশায় শিমলা, কুলু মানালিতে সামার ট্যুরে বেড়িয়ে পড়েছিল। এখানেই কুলু উপত্যকায় বান্দ্রোলে এসে বিয়াসের তীরে এমনই এক পাহাড়ি কন্যার রূপে মন হারিয়ে গিয়েছিল।
ভাবনায় ডুবে নিকট অতীতে হারিয়েই গেছিল ঋক। চমক ভাঙলো ড্রাইভার এর ডাকাডাকি ও গাড়ির তীব্র হর্ণে।
'ও সাহাব, আউর কিতনা দের করেঙ্গে? অব তো চালিয়ে, নহী তো বহত দের হো জায়েগা!'
ড্রাইভারের কথায় সম্বিত ফেরে। বারেক ফিরে দেখলো অনতিদূরের সেই মেয়েটিকে। তারপর হাতের আধখাওয়া সিগারেটের টুকরোটায় একটা ছোট্ট টান দিয়ে বাকি অংশ মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে গাড়িতে উঠে এলো। গাড়ি চলতে শুরু করলে, ড্রাইভার একবার লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে ঋক কে চুপচাপ থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, 'আপ ইতনি উদাস কিঁউ হ্যায়? ইতনা খোয়া খোয়া!'
ঋক জানালার থেকে চোখ সরিয়ে ড্রাইভার-এর চোখে চোখ রেখে স্মিত হেসে বলে, 'খোয়া হুয়া! নাহী তো? বস, ইয়ে ঝর্ণে, ওহ্ পাহাড়ো, ঔর ইয়ে বাদীয়া, দেখতাই রহতা হুঁ। উসমেহি খো জাতা হুঁ।'
হাসল ড্রাইভার ছেলেটি। হয়তো তার বয়স তিরিশের কোঠায়। কিন্তু দিল্লি শিমলা কুলু মানালি করতে গিয়ে আর বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলা ও তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে কত জানাশোনাই না হলো। এভাবেই তাদের মনের হদিশও পেয়ে গেছে এই বয়সে। তাই কোনটা উদাস, কোনটা হারিয়ে যাওয়া আর কোনটা উপভোগ করার মন তার কাছে তা স্পষ্ট। সেই হাসি ঋকের নজর এড়ায়নি। সে প্রশ্ন রাখলো, 'কিঁউ? তুমহে য়কীন নহী আয়া?'
'হাঁ হাঁ, কিঁউ নহী।' দ্রুত বলে ড্রাইভার ছেলেটি। 'ইয়ে বাদীয়া ইয়ে নজারে খো জানে কে লিয়েই তো হ্যায়।' তারপর আপন মনে বলে চলে, 'দেখিয়ে সাহাব, দেখিয়ে। জ্বী ভরকে দেখিয়ে। ইন্ হে দেখনে কে লিয়েঁ তো সাল ভর আদমি সারে দুনিয়া সে আতে রহতে হ্যায়।'
ওদিকে তখন ঋকের মনে অন্য নজারা, অন্য স্বপ্ন! ফ্লাশব্যাকে সে ফিরে গেল গত মার্চের সেই দিনটাতে।
অফিস কলিগ সাম্য, বিভাস, সে নিজে আর বাল্যবন্ধু চার্ণক। ওরা চারজনের টিম, এসেছিল এখানেই সামার ট্যুরে। কী ভীষণ এনজয় করেছিল! পাহাড়, নদী, ঝর্ণা, গাছপালা, আঁকাবাকা পথ, পাহাড়ের কোলে নাম না-জানা ছোট ছোট গ্রাম, চটি, ফলের বাগান, ঝুম চাষ আর পাহাড়ি কন্যা। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য সময় কেটে যাচ্ছিল। তার সাথে লেগপুল! এদের সকলেই স্মোকার। কমবেশি স্মোকিং করে। তারসাথে আধুনিক জীবনের এক অত্যাবশকীয় কারণসুধায় কারণে অকারণে ডুবে যেতে জুড়ি মেলা ভার। রণে বনে জলে জঙ্গলে ব্যাসনে উৎসবে এই পানীয় ছাড়া সবটাই যেন ফিকে, পানসে। তবে ঋক এদের মধ্যে একটু আলাদা। সে যেমন স্মোকিং কম করে, ঠিক তেমনই পানীয়ের প্রতি অন্যদের তুলনায় অনীহাই বেশি। তবে একযাত্রায় তো আর পৃথক ফল হতে পারে না, তাই আসরে বা মজলিসে ছোট ছোট পেগ তুলে নিতে হয়। সে সব নিয়ে লেগ পুলিংও হয়।
সেদিন, কুলু উপত্যকায় বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার সময়, চার্ণকের মনে হলো, 'যদি একবার বান্দ্রোল-এর ফ্রুট মাণ্ডিতে ঘুরে যাওয়া যেত? শুনেছি এটা খুব বিখ্যাত জায়গা। এখানে টন টন উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের আপেল, নাশপাতি, বরই, পীচ ছাড়াও উন্নত শাকসবজিও সংরক্ষণ করা এবং তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ সুচারু ভাবে করা হয়। শুধুমাত্র কাঁচা ফলই নয়, বাড়তি শুকনো ফল প্যাকেটজাত করে সাপ্লাই করা হয়। চল না একবার ঘুরে দেখে আসি!'
সাম্যের এসব ক্ষেত্রে আগ্রহ ও উৎসাহ দুটোই সমান। বলে, 'বেশ তো চলো না। আমরা তো বেড়াতেই এসেছি, সব দেখতে, জানতে। বাকিরা কি বলে?'
ঋক বলে, 'অবশ্যই যাবো। আমি এসবে একপায়ে খাড়া। বিভাস, তুমি যাবে তো?'
বিভাস সাত পাঁচ না ভেবেই বলে, 'আমি না বললে শুনছে কে? তাছাড়া, এক যাত্রায়-' বিভাসের কথা শেষ হওয়ার আগে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। এই গ্রুপের কেউ স্মোক বেশি করে, কেউ ড্রিংক। কারও রমণীতে আসক্তি তো কারও ভালোবাসা প্রকৃতি। তবে সকলেই যখন একসাথে তখন ঋকের কথা অনুযায়ী 'এক যাত্রায় পৃথক ফল!' সেটি হবার জো নেই।
হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কির মধ্যে দিয়ে ফ্রুট মাণ্ডি, বিভিন্ন ফলের বাগান, এছাড়াও ১৮৭০ সালে তৈরি করা প্রথম আপেল বাগান, (যা আজও বিশেষভাবে সংরক্ষিত) হয়তো শুরুর সেই গাছ আজ নেই, তবে সেই বাগানের অস্তিত্ব কত সুন্দর ভাবে টিকিয়ে রাখা, যা দেখা ও স্পর্শ করার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে, সে সব ঘুরে বেড়িয়ে অনেকটা সময় অতিবাহিত করে ওরা এসে পৌঁছালো বিপাশা নদীর তীরে। এই সেই বিয়াস! যার স্বচ্ছ নীলচে জলের ধারায় কোথাও খরস্রোতা তো আবার কোথাও মৃদু অথচ বেগবতী তার বুকে বিপুল জলরাশি নিয়ে ছুটে চলেছে আপন খেয়ালে। কোথাও কোথাও পা ডোবা জলে অনায়াসে পার হয়ে যায় মানুষ জন, প্রাণী।
একটা দৃশ্যে হঠাৎই চোখ আটকে যায়
Comments
Post a Comment