বিয়াস ( এক নদী ও এক নারী'র গল্প ) / কলমে- সুদর্শন দত্ত
বিয়াস ( এক নদী ও এক নারী'র গল্প )
সুদর্শন দত্ত
।।এক।।
ঋকসাম মুখার্জি ওরফে ঋক একটা বহুজাতিক সংস্থায় উচ্চপদস্থ চাকুরে। তার মা, বাবা, আর ছোট বোনের সাথে দক্ষিণ কোলকাতার এক বিলাসবহুল এ্যাপার্টমেন্টে বসবাস। অত্যাধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলেও নিজেকে সবসময় তার মোড়কে মুড়ে না রেখে উন্মুক্ত করতে ভীষণ ভালোবাসে। ভ্রমণের নেশা, অজানাকে জানা আর অচেনাকে চেনার এক দুর্নিবার টান তার মনের মধ্যে। তাই যখন যেখানে মন চায় বেরিয়ে পড়ে।
আজও এইমুহূর্তে সে তার রুকস্যাক গোছাতে ব্যস্ত। এবারের গন্তব্যও কুলু মানালি। এর আগেও একবার এই উপত্যকা ঘুরে গেছে। দারুণ সব সিনারিও, মনকাড়া নৈসর্গিক দৃশ্য, বিশেষ করে কুলু উপত্যকা, বিয়াস নদী, রঘুনাথ মন্দির, বীর বাবার মন্দির, পাহাড়ের পাদদেশে অচীন গ্রাম সেখানের মানুষ জন আর তাদের জীবনযাত্রার কি অপূর্ব নান্দনিক ছবি! কুলু হল হিমাচল প্রদেশের সেই জেলা যেখানে ভারতের প্রথম আপেল বাগান রোপন করা হয়েছিল এর বান্দ্রোল গ্রামে, আনুমানিক ১৮৭০ সালে। তাই ঐতিহাসিক ভাবে এর আলাদা একটা গুরুত্ব রয়ে গেছে। এছাড়া নাগগার এখানের মন্দির শহর। অনেক দর্শনীয় মন্দির যা অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থান হিসাবে গণ্য হয়।
তবে এসবের বাইরেও আরও এক গভীর টান ঋক-কে সেখানে ছুটে যেতে বাধ্য করছে। কি সেই টান! কি সেই অনুভব! কোন সেই তাগিদ আবার তাকে সেই নৈসর্গিক উপত্যকায় দ্বিতীয় বারের জন্য ছুটে যেতে বাধ্য করলো! বান্দ্রোল-এর আরও একটা পরিচয় আছে ফ্রুট মাণ্ডি হিসেবে। শেষ বার এখানেই দেখা হয়েছিল এক পাহাড়ি ঝর্ণার সাথে। উচ্ছ্বল তটিণীর মতো পাহাড় থেকে পাহাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলা, উথ্লে উছলে ওঠা, তরঙ্গায়িত! তার সুরে প্রায় হারিয়েই গেছিল সেবার ঋক।
ফিরে আসার আগে বিয়াসের তীরে তার বিয়াসকে কথা দিয়ে আসা। ফোন নাম্বার বিনিময়। তারপর থেকেই ঘনঘন চ্যাটিং। সেই বিয়াস যেন তাকে চোখে হারায় এমনই তার প্রতি দশটা চ্যাটিং-এ একটায় উল্লেখ থাকছেই। তার টানেই আবার বুঝি ছুটে যাওয়া।
ভাবনাটা আবার জাঁকিয়ে বসেছে ঠিক এমন সময় ঋতাভরী তার মা, ও ছোট বোন তন্দ্রা তার ঘরে উপস্থিত হল। ছড়ানো ছিটানো ঘরে সব জিনিস কখনোই কোনো জিনিস গুছিয়ে রাখে না ঋক। আজ তো আরও নেই। নেবে বলে একটা করে জিনিস টেনে বার করছে। আবার পছন্দ না হলে ফেলে রাখছে নয়তো ইতস্তত ছুঁড়ে দিচ্ছে। সেসব দেখে ঋতাভরী বলে, 'একী! কি অবস্থা ঘরের? এত অগোছালো, ছড়ানো ছিটানো কেন? এসব কি হচ্ছে ঋক?'
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঋক বলে, 'কেন মা? ঠিকই তো আছে। যেটা লাগবে না মনে হচ্ছে সরিয়ে রাখছি!'
ঋতাভরী বলে, 'তাই বলে এভাবে? সব জিনিস টেনে বার করার কি প্রয়োজন? যেটা লাগবে মনে করে নে। আর যেটা প্রয়োজন নেই অনর্থক বার করিস না। এতসব আবার গোছাতেও সময় অপচয় হয়, তাই না? তাছাড়া কার এতো সময় আছে বল তো? বুঝতি, যদি বউ থাকতো আর তাকে গোছাতে হত!'
হাসলো ঋক। বেশ মিনিংফুল হাসি। বললো, "বউ! হাঃ!' বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে হাত দিয়ে ওড়ানোর ভঙ্গি করে ডানপাশে ঘাড় নাড়ালো।
তার এই তাচ্ছিল্যের প্রকাশ ভালো ভাবে নিলো না ঋতাভরী, 'উড়িয়ে দিচ্ছিস তো এখন! বেশ। ঘুরে আয় তারপর আমিও দেখবো কত ওড়াস আর উড়তে পারিস? এমন বন্ধনে বাঁধবো না, যে চাইলেও-'
ঋতাভরীর কথা শেষ হলো না, থমকে গিয়ে একটু তীক্ষ্ণ নজরে চাইলো তার দিকে ঋক। তার মা কি বলতে বা বোঝাতে চাইছে সেটাই বুঝতে চাইছে সে। বন্ধন, বাঁধা এসব শব্দের মানেটা বুঝে নিতে চাইছে। তারপর প্রশ্নটা করেই ফেলে, 'হোয়াট বন্ধন, বাঁধার কথা বলছো? আই ডিডনট্ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট ডু য়ু মীন বাই দিজ্ ওয়র্ডস্!'
'ফিরে আয়, তারপর বুঝবি। কবে ফিরছিস যেন?'
'ওই তো, আঠাশ তারিখ। দশদিন মোট। কেন বলি নি তোমায়? কিন্তু কেন বলো তো? একটু রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে?'
তন্দ্রা কোনো রাখঢাক না করে তার উত্তরটা দিলো, 'হ্যাঁ, রহস্যই বটে! তবে তোর বিয়ে, আই মীন তোর জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। এবারে-'
'হোয়াট!' চমকে উঠে প্রায় চিৎকার করে ওঠে ঋক। 'বিয়ে! আমার?'
ঋতাভরী বলে, 'এমন করে চমকে উঠলি মনে হচ্ছে এসব ব্যাপারে কোন ইচ্ছেই তোর নেই?' একটু থেমে সংযোজন করে, 'সে তোর ইচ্ছে আছে কি নেই তা বুঝবো পরে। আমরা মোটামুটি একটা মেয়ে দেখে রেখেছি। ফিরে এলে একবার তুই দেখে নিলে ফাইনাল করে নেব।'
এবার যেন আরও বেশি চমকিত হলো ঋক। বললো, 'একেবারে ফাইনাল? দেখাশোনা কমপ্লিট! তবে আর কি?'
তন্দ্রা বলে, 'হ্যাঁ রে দাভাই। কি দারুণ দেখতে! তার ওপর ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি চাকরি।'
'ও, তার মানে তোরও দেখা?' তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বলে, 'আর কি, সব তো তোমরা ঠিক করেই রেখেছো। আমার আর কি প্রয়োজন?'
'না, মানে -'
'স্টপ, আই সে স্টপ দিস ননসেন্স। আমার মতামত, পছন্দ অপছন্দ, আমার ইচ্ছে অনিচ্ছে, ভালো মন্দ, এসবের কোনো মূল্য নেই? আমি কি চাই? কিসে আমার ভালো লাগে, এসব দেখবে না তোমরা?'
কথাগুলো বলে ঋতাভরীর দিকে ব্যথিত চোখে তাকালো ঋক। তারপর বললো, 'তোমরা এখন এসো মা। আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে দাও। এখন এইসময় এসব প্রসঙ্গ আলোচনার নয়। একচ্যুয়েলী কি বলোতো? আমি একটু পৃথিবীটাকে মনের মত করে দেখতে চাই, উপলব্ধি করতে চাই। এর রূপ রস গন্ধে নিজেকে-' কথাটা শেষ না করে বলে, 'তারপর তো জীবন পড়ে রইলোই। কোনো একদিন কোনো এক সময়ে টুক করে কোনো একজনকে বিয়ে করে নিলেই হলো। সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না!'
ঋতাভরী কি বলবে তক্ষুনি ঠিক গুছিয়ে উঠতে না পারলে তন্দ্রা দ্রুত সংযোজন করলো, 'টুক করে একজনকে বিয়ে করে নিলেই হলো! তারমানে তোর বিয়ের ষোলোআনা ইচ্ছে রয়েছে। তো, এখন করলে অসুবিধাটা কোথায়, সেটা তো বলবি? এরপর বুড়ো হয়ে যাবি! এখনই ত্রিশ পার! এরপর আর কে তোকে বিয়ে করবে বলতে পারিস?' শেষের কথাগুলো যেন ইচ্ছে করেই বললো তন্দ্রা। কিছুটা পিঞ্চ করে।
থমকে গিয়ে ব্যাগ গোছানো বন্ধ রেখে ছোটবোনের দিদিগিরি সহ্য না করতে পেরে কপট রাগে সামান্য ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই তেরছা দৃষ্টি হেনে বললো, 'ওরে আমার বুড়ি ঠাকুমা এলেন রে, এরপর কে পছন্দ করবে! কেন কেন, বলি কেন রে? আমার ত্রিশ, সেটা তোকে কে বললে? আর তাছাড়া এটা কি বর্তমানে কোনো বয়স হলো নাকি? চল্লিশের পরও কত পুরুষ মানুষ বিয়ে করছে দেখ গে যা।'
চোখ বড় বড় করে তন্দ্রা বললো, 'কি বল্লি! তার মানে ত্রিশ হয় নি? আমারই তো বলে,' থমকে গেল সে। নিজের বয়স প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে তন্দ্রা হোঁচট খেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, 'চল্লিশের পরে বিয়ে সেটা মোটেও বিয়ের পর্যায়ে পড়ে না। ঢাক ঢোল পিটিয়ে একশোটা লোকের উপস্থিতি, আনন্দ উল্লাস, উফ্, তার মজাই আলাদা। আর চল্লিশ পার করে গেলে, ডাক্তাররাই বলে, ফর আপকামিং নেক্সট জেনারেশন, ইটস মে অকার ডেঞ্জার টু বার্থ নিউ বেবি!'
ততক্ষণে সোজা দাঁড়িয়ে তন্দ্রার কথা শুনে বিস্মিত ঋকের চোখদুটো গোলগোল হয়ে গিয়ে অবাক নজরে তার থেকে অন্তত ছয় বছরের ছোট বোনের দিকে চেয়ে আছে। বিস্ময় কণ্ঠে বলে, 'বাব্বা, তুই তো দেখছি আজকাল অনেক জানিস! ঢাক ঢোল, আনন্দ উল্লাস, আপকামিং জেনারেশন, ডেঞ্জার টু নিউ বেবি! হোয়াট আ সারপ্রাইজ, মা!' বলে ঋতাভরীর দিকে তাকালো ঋক। বললো, 'তুমি বুঝতে পারছো তো মা? কত গভীরে আমার বোনের ভাবনা চিন্তা! তুমি বরং ওরটাই আগে সেরে ফেলো। সী ইজ মোর এ্যাডভান্স দ্যান আদার।'
ঋতাভরী বলে, 'সে পরে ভাবা যাবে। আগে তো তোরটা সারি। তারপর যে কথা বলবো বলে এসেছিলাম। তোর বাবারও ভীষণ পছন্দ, আর তারও খুব ইচ্ছে ঐ মেয়েকেই তুই বিয়ে করিস। অবশ্য মেয়েটাকে দেখলে তোরও পছন্দ হবে এটা নিশ্চিত বলতে পারি।'
'বাবা, এতটা নিশ্চিত কি করে হতে পারছো? তোমাদের পছন্দ যে আমার সাথে মেলে এমন উদাহরণ তো হাতের কাছে কিছুই পাচ্ছি না, তো সেই নিশ্চয়তা আসছে কোত্থেকে? না না, তোমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে!'
ঋকের কথা শুনে ঋতাভরী কয়েক পলক তার দিকে চেয়ে থেকে যাবার আগে বলে গেল, 'বেশ! এবার ট্যুর টা কমপ্লিট করে এসো। তারপর দেখছি আমাদের পছন্দ আর তোমার পছন্দের পার্থক্যটা ঠিক কতটুকু।'
কথাগুলো শেষ করে দ্রুত ঋকের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো ঋতাভরী। ঋক জানে, যখন তার মা খুব রেগে যায়, তখন তাকে 'তুমি' সম্বোধন করে কথা বলে। সে তাকালো তন্দ্রার চোখের দিকে। তন্দ্রা ঠোঁট উল্টে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো, 'সে অন্তত এই ব্যাপারে কিছুই জানে না।'
একটু থমকে আবার নিজের প্রয়োজনীয় বাকি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও মনের ভেতরে কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করলো ঋক। তারপরেই তার হাতের অত্যাধুনিক লেক্সিংটোন রিস্টওয়াচে সময় দেখে নিয়ে স্বগতোক্তি করলো, 'এইরে! প্লেনের টাইম তো হয়ে এলো। ইটস্ লেস দেন ফোর আওয়ার্স ওনলি দ্যাট আই হ্যাভ। সো বি ক্যুইক, ঋক! ফাস্ট, মোর ফাস্ট! এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে নটার মধ্যে।' শেষ বাক্যে যেন নিজেকেই উজ্জীবিত করার কথা বলে আরও দ্রুত তৈরি করে নিতে। কয়দিন বেড়াতে যাবার জন্য ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছে, তাই একটা ওলা বুক করে নিয়েছে এয়ারপোর্টে যাওয়ার। এরপর বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। দিল্লি যাবার প্লেন ঠিক রাত দশটা পঁয়তাল্লিশ। তার সমস্ত মন প্রাণ জুড়ে এখন ভ্যালি অব কুলু। 'বিয়াস' দ্য নেচার অব বিউটি!
রাতটা দিল্লিতে কাটিয়ে পরের দিন ফ্রেশ হয়ে খুব সকালে শিমলার উদ্দেশ্যে রওনা দিল ঋক। প্রথমে ভেবেছিল সরকারি বাসে করেই যাবে। পরে একটা গাড়ি ভাড়া করে দীর্ঘ যাত্রায় একাকী সফরেই মনস্থির করে বেরিয়ে পড়ে। একলা চলায় ইচ্ছে মত থামা চলা আর চারিদিকের সিনারিও উপভোগে যে আনন্দ আছে বাসে করে যাত্রাপথে তা আর কোথায়?
ক্রমশঃ…
Comments
Post a Comment